মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের উপায়ঃ
বর্তমান পৃথিবীতে যত জটিল ও মারাত্মক সমস্যা রয়েছে, তন্মধ্যে মাদকদ্রব্য ও মাদকাসক্তি হল সবকিছুর শীর্ষে। যুদ্ধবিগ্রহের চেয়েও এটা ভয়ংকর। কারণ কোন যুদ্ধের মাধ্যমে একটি জাতি-গোষ্ঠীকে দ্বংস করতে হাইলেও একেবারে তা নির্মূল করা সম্ভব নং: যা কিনা মাদকতার মাধ্যমে সম্ভব। বাংলাদেশ মাদকতার হিং¯্র ছোবলে এখন আক্রান্ত এবং দেশটি দ্রুত দ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অথচ এ জাতির এখনও হুঁশ হচ্ছে না অন্যভাবে বলা যায়, আমাদের সমাজ এখন মাদক ক্যান্সারে আক্রান্ত। যার শেষ পরিণতি অনিবার্য মৃত্যু। সমাজকে মাদকমুক্ত করা সম্ভব না হলে জাতি দ্বংসের অতল গহবরে নিমজ্জিত হবে। এ নিবন্ধে মাদকমুতক্ত সমাজ গঠনের উপায় আলোকপাত করা হল।
মাদকদ্রব্য সেবনের ক্ষতিকর দিক সমূহ:
বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ, ভূমিকম্প বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের চেয়ে মাদকাসক্তির ভয়াবহতা আরও মারাত্মক ও ভয়ংকর। একটি পরিবারে বা সমাজে অশান্তি ও বিশৃংখলা সৃষ্টির জন্য একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তিই যথেষ্ট।
১, শারীরিক ক্ষতি: মাদকদ্রব্য সেবনে সবচেয়ে মারাত্মক ক্ষতি হল মানুষের শারীরিক ক্ষতি। যে কারণে একজন মানুষের শরীর ক্রমে ক্রমে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। মাদকদ্রব্য সেবনে মানুষ দৈহিক যে সমস্ত ক্ষতির সম্মুখীন হয় তা হল ১) লিভার প্রসারিত হওয়া (২) মুখমন্ডল ফুলে যাওয়া ও বিকৃত হওয়া (৩) মাদকদ্রব্যের প্রতি সংবেদনশীলতা হরাস-বৃদ্ধি পাওয়া (৪) মুখ ও নাক লাল হওয়া (৫) মুখমন্ডল সহ সারা শরীরে কালশিরে পড়া (৬) হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়া (৭) বুক ও ফুসফুস নষ্ট হওয়া (৮) স্মরণশক্তি কমে যাওয়া (৯) যৌনশক্তি কমে যাওয়া (১০) চর্ম ও যৌন রোগ বৃদ্ধি পাওয়া (১১) স্ত্রীর গর্ভে ঔরসজাত সন্তান বিকলাঙ্গ বা নানারোগে আক্রান্ত হয়ে জন্ম নেয়া (১২) হঠাৎ চেখে কম দেখা (১৩) নাসিকার ঝিল্লি ফুলে উঠা (১৪) ব্রংকাইটিস রোগ বৃদ্ধি সহ বুকের নানা সমস্যা দেখা দেয়
(১৫) সংক্রামক রোগ বৃদ্ধি পাওয়া
(১৬) হজমশক্তি হরাস পাওয়া ও খাবারের প্রতি রুচি কমে যাওয়া (১৭) দীর্ঘ সময় ধরে ঠান্ডা লাগা ও ফ্লুজ্বরে আক্রান্ত হওয়া (১৮) হঠাৎ শিউরে উঠা (১৯) অপুষ্টিতে আক্রান্ত হওয়া (২০) স্মৃতিশক্তির কোষ ধ্বংস করা।
ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য গ্রহণের ফলে ফুসফুস ও মুখগহবরে ক্যান্সার সহ ২৫ প্রকার রোগ সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে এবং এদের পাশে অধূমপায়ীরা অবস্থান করলে ঐসব রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রায় ৩০ শতাংশ ঝুঁকির মধ্যে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক ও ভেজাল খাদ্যের কারণেই মরণব্যাধি লিভার ও ব্লাড ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত। যার কারণে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি লোক ক্যান্সারে আক্রান্ত (২০১২ সালের হিসাব অনুযায়ী)। বিশ্বের প্রায় ৫০ কোটি মানুষ মাদকের সাথে জড়িত মে ২০০৭-এর হিসাব মতে)। এক গবেষণায় দেখা যায়, যদি কেউ ১৩টি সিগারেট টানে, তাহলে তার ফুসফুসে ক্যান্সারের ঝুঁকি সাতগুণ বৃদ্ধি পায়। আর যদি ২০ টি সিগারেট টানে তাহলে তার ক্যান্সারের ঝুঁকি ২০ গুন বেড়ে যায়। জাতিসংঘ স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ধূমপানের ফলে প্রতি সাড়ে ছয় সেকেন্ডে বিশ্বে ১ জন মানুষ মারা যায়।
মাদকতা প্রতিরোধের উপায়
বর্তমান সমাজে মাদকতার ব্যাপক প্রসার ঘটছে। দিনে দিনে তরুণ-তরুণী, ছাত্র-ছাত্রী সহ বিভিন্ন পেশা-শ্রেণীর মধ্যে মাদকাসক্তের হার যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে কয়েক বছর পর দেশে সুস্থ লোক পাওয়া দুস্কর হবে। বর্তমানে কোন কোন সেচ্ছাসেবী সংগঠন এ বিষয়ে কিছুটা এগিয়ে আসলেও সরকার এ বিষয়ে নীরব রয়েছে। মাদক প্রতিরোধে সরকারকেই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। রাজনৈতিক হানাহানি নয়: বরং সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে মাদকতার বিরুদ্ধে কাজ করতে হবে। এখানে মাদকতা প্রতিরোধে কতিপয় প্রস্তাবনা ও দিক নির্দেশনা তুলে ধরা হল-
মাদকদ্রব্য প্রতিরোধের উপায় প্রধানত দুটি। যথা- (১) নৈতিক ও ধর্মীয় (২) রাষ্ট্রীয় বা প্রশাসনিক।
নৈতিক ও ধর্মীয় উপায়ে মাদকতা নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের ব্যবস্থা: বাংলাদেশে শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের বসবাস। এখানে ধর্মীয় অনুভূতি ও চেতনা সৃষ্টির মাধ্যমে মাদকতা নির্মূল করা সম্ভব। ইসলামী দল, সংস্থার দায়িত্বশীল, মসজিদের ইমাম ও খতীব, ইসলামী জালসা ও সেমিনারে আলোচকদের মাধ্যমে মাদকের দুনিয়াবী ক্ষতি ও পরিণতি এবং পরকলে এর শাস্তি ও ফলাফলের বিষয়টি তুলে ধরতে হবে।
রাষ্ট্রীয় বা প্রশাসনিক প্রতিরোধ: কোন দেশের প্রশাসন যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে প্রশাসনের সামনে অপরাধ কর্মকান্ড হওয়াই স্বাভাবিক । মাদকতা বন্ধে আমাদের কতিপয় প্রস্তাবনা।-
১. মাদকদ্রব্য উৎপাদন ও সরবরাহের লাইসেন্স বন্ধ করতে হবে।
২. পুলিশ প্রশাসনকে দুর্নীতিমুক্ত থেকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।
৩. মাদকদ্রব্য প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে পৃথক অধিদফতর গঠন করে সংশ্লিষ্টদেরকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে।
৪. মাদকাসক্ত ব্যক্তি ও মাদকের সাথে জড়িতদের প্রকাশ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
অতএব আল্লাহ আমাদের সবাইকে মাদকতা থেকে বেঁচে থাকার এবং এগুলো
প্রতিরোধ করার তাওফীক দান করুন- আমীন!

No comments:
Post a Comment